ব্লগ
আকিদা- বিশ্বাস

তাফবীয ও তা’বীল: সিফাত সংক্রান্ত নুসূসের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় মানহাজ

লেখক: জুবাইর আহমাদ ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

তাফবীয ও তা’বীল: সিফাত সংক্রান্ত নুসূসের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় মানহাজ
বরেণ্য ইমামগণের সাক্ষ্য: পর্ব-০১

ইমাম মুহিউদ্দীন নববী রহ. (৬৭৬ হি.) এর সাক্ষ্য

উম্মতের অনুসরণীয় সালাফদের থেকে শুরু করে যুগ যুগ ধরে উলামায়ে কেরাম সিফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের ক্ষেত্রে দুটি মানহাজ বা কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করে আসছেন। এক. তাফবীয। দুই. তা’বীল। প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এসব নুসূসের বাহ্যিক অর্থ কোনোভাবেই উদ্দেশ্য নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইমামগণ এসব নুসূসের প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলার দিকে সোপর্দ করেছেন, এবং এ ব্যাপারে কোনো কথা বলা থেকে বিরত থেকেছেন। আবার কেউবা প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কখনো এসবের বিভিন্ন তা’বীলও করেছেন। ইমাম নববী রহ. তার শরহু মুসলিম সহ বিভিন্ন কিতাবের অসংখ্য জায়গায় এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। নিম্নে এ ব্যাপারে তার এর বক্তব্য তুলে ধরা হলো-

সিফাত সংক্রান্ত নুসূসের ব্যাপারে অনুসরণীয় মানহাজরে ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম নববী রহ. বলেন,

إعلم أن لأهل العلم في أحاديث الصفات وآيات الصفات قولين: أحدهما وهو مذهب معظم السلف أو كلهم؛ أنه لا لا يتكلم في معناها، بل يقولون: يجب علينا أن نؤمن بها ونعتقد لها معنى يليق بجلال الله تعالى وعظمته، مع إعتقادنا الجازم أن الله تعالى ليس كمثله شيئ، وأنه منزه عن التجسيم والإنتقال والتحيز في جهة وعن سائر صفات المخلوق. وهذا القول هو مذهب جماعة من المتكلمين، واختاره جماعة من محقيقيهم، وهو أسلم. والقول الثاني وهو مذهب معظم المتكلمين؛ أنها تتأول على ما يليق بها حسب مواقعها. وإنما يسوغ تأويلها لمن كان من أهله بأن يكون عارفا بلسان العرب وقواعد الأصول والفروع ذا رياضة في العلم.

জেনে রাখ, সীফাত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে আহলে ইলমগণ দু’ধরণের কর্মপন্থা অবলম্বন করে থাকেন।

এক. এটি অধিকাংশ সালাফ বা সকল সালাফের কর্মপন্থা। পন্থাটি হলো- এসব আয়াত ও হাদীসের অর্থের ব্যাপারে কোনো কথা বলা যাবে না। বরং তারা বলেন, আমাদের জন্য আবশ্যক হলো- আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনব এবং এ বিশ্বাস করব যে, নিশ্চয় এখানে ঐ অর্থই উদ্দেশ্য যা আল্লাহ তাআলার মহান শানের সাথে উপযোক্ত। সাথে সাথে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলার অনুরুপ কোনো কিছুই নেই। তিনি দেহ, স্থানান্তর, কোনো দিকে অবস্থান করা ও মাখলুকের সমস্ত বৈশিষ্ট থেকে মুক্ত। মুতাকাল্লিমদের একটি জামাতও এই কর্মপন্থা অবলম্বন করে থাকেন। এবং মুহাক্কিক মুতাকাল্লিমদের একটি দল এটিকেই প্রণিধানযোগ্য হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এই পদ্ধতিটি অধিক নিরাপদ।

দুই. এটি অধিকাংশ মুতাকাল্লিমদের কর্মপন্থা। সেটি হলো- এসব আয়াত ও হাদীসের নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা করা হবে। তবে ব্যাখ্যা করাটা তাদের জন্যই যায়েজ হবে, যারা এর উপযোক্ত। তারা হবেন আরবি ভাষা, ফিকহ ও উসূলুল ফিকহের নিয়ম-কানুনের উপর পারদর্শী এবং ইলমী গবেষণায় প্রাজ্ঞ ব্যক্তি।

শরহু মুসলিম: ৩/১৯

ইমাম নববী রহ. আরো বলেন,

قوله صلى الله عليه وسلم: ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا فيقول من يدعوني فاستجيب له" هذا من أحاديث الصفات. وفيه مذهبان مشهوران للعلماء، سبق توضيحهما في كتاب الإيمان. ومختصرهما: أن أحدهما وهو مذهب جمهور السلف وبعض المتكلمين؛ أنه يؤمن بأنها حق على ما يليق بالله تعالى، وأن ظاهرها المتعارف في حقنا غير مراد، ولا يتكلم في تأويلها مع اعتقاد تنزيه الله تعالى عن صفات المخلوق وعن الإنتقال والحركات وسائر سمات الخلق. والثاني مذهب أكثر المتكلمين وجماعات من السلف وهو محكي هنا عن مالك والأوزاعي؛ أنها تتؤول على ما يليق يها حسب مواطنها. فعلى هذا تأولوا هذا الحديث تأويلين؛ أحدهما: تأويل مالك بن أنس وغيره؛ تنزل رحمته وأمره وملائكته كما يقال فعل السلطان كذا، إذا فعله أتباعه من أمره. والثاني: أنه على الإستعارة، ومعناه الإقبال على الداعين بالإجابة واللطف. والله أعلم.

“নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী- “আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নুযূল হন এবং বলেন, যে আমার কাছে দুআ’ করবে আমি তার ডাকে সাড়া দিব।” এই হাদীসটি সিফাত সংক্রান্ত হাদীসের অন্তর্ভূক্ত। আর এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের দুটি কর্মপদ্ধতি রয়েছে যা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। আর এ কর্মপদ্ধতিদ্বয়ের ব্যাপারে ইতিপূর্বে কিতাবুল ইমানে আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে পদ্ধতিদুটি হলো-

এক. এটি অধিকাংশ সালাফ এবং মুতাকাল্লিমদের একাংশের মতামত। তা হলো- এ বিশ্বাস রাখা যে, এগুলো সত্য, তবে যেভাবে আল্লাহ তাআলার শান অনুযায়ী উপযোক্ত হয় সেভাবে। আমাদের ক্ষেত্রে এসব শব্দের যে বাহ্যিক অর্থ স্বাভাবিকভাবে বুঝে আসে-তা কখনোই উদ্দেশ্য নয়। এগুলোর কোনো তা’বীল বা ব্যাখ্যা করা যাবে না। সাথে সাথে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা মাখলুকের বৈশিষ্ট, স্থানান্তর, নড়াচড়া ও সৃষ্ট হওয়ার সকল নিদর্শণ থেকে মুক্ত ও পবিত্র।

দুই. এটি অধিকাংশ মুতাকাল্লিম ও একদল সালাফের মানহাজ, এবং এটি ইমাম মালিক ও ইমাম আওযায়ী রহ. থেকেও বর্ণিত আছে। তা হলো- এগুলোর প্রতিটির নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী উপযুক্ত পন্থায় তা’বীল বা ব্যাখ্যা করতে হবে। আর এ মানহাজের উপর ভিত্তি করেই উলামায়ে কেরাম এই হাদিসটির দুটি ব্যাখ্যা করেছেন। এক. এখানে ‘আল্লাহ তাআলা নুযূল হন’ এর মানে হলো- তার রহমত, নির্দেশ ও ফেরেশতাগণ নুযূল বা অবতরণ করেন। যেমনিভাবে সুলতানের কর্মকর্তাগণ কোনো কাজ করলে বলা হয়- সুলতান অমুক কাজ করেছেন। দুই. এখানে নুযূল শব্দটিকে রূপকার্থে ব্যাবহার করা হয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বান্দাদের ডাকে সাড়া দেওয়া ও দয়া পরশ হওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি বিশেষ মনোনিবেশ করা।”

শরহু মুসলিম:৬/৩৬

এখানে ইমাম নববী রহ. যে দুটি মানহাজের কথা উল্লেখ করেছেন তা নিম্নরূপ-

প্রথম মানহাজ: এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়-

এক. আল্লাহ তাআলা স্থানান্তর, নড়াচড়া ও সৃষ্টির সকল গুণাবলি থেকে মুক্ত। তাই এসব নুসূসের স্বাভাবিক বাহ্যিক অর্থ কখনোই উদ্দেশ্য নয়।

দুই. এসব নুসূসের অর্থ নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। বরং এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এসব জিনিস আল্লাহ তাআলার ক্ষেত্রে সেভাবেই প্রযোজ্য, যেভাবে তাঁর শানে মানায়।

প্রথম অংশটিকে পরিভাষায় তানযীহ বলা হয়। আর দ্বিতীয়টিকে অর্থাৎ, অর্থের ব্যাপারে কোনো কথা না বলে, এসবের প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলার দিকে সোপর্দ করাকে পরিভাষায় তাফবীয বলে। আর পুরো ব্যাপারটিকে পরিভাষায় “তাফবীয মাআত তানযীহ” বলে।

দ্বিতীয় মানহাজ: এসব আয়াত ও হাদীসের নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা করা হবে। যাকে পরিভাষায় তা’বীল বলা হয়।

উল্লেখ্য যে, তা’বীলের ক্ষেত্রেও প্রথমে তানযীহ করতে হবে। অর্থাৎ, এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা স্থানান্তর, নড়াচড়া ও সৃষ্টির সকল গুণাবলি থেকে মুক্ত। সুতরাং এখানেও এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে “তা’বীল মাআত তানযীহ” বলে।


সব প্রবন্ধ ও ব্লগ দেখুন